অনুবাদ: সায়মন আলী ও মনিরুল ইসলাম
অনুবাদকের ভূমিকা

ব্যুপনিবেশায়নের আলাপ নতুন নয়। সন-তারিখ ধরে বলতে গেলে উনিশ শতকের প্রথমার্ধেই, তা যে মাত্রাতেই হোক না কেন, এই আলাপ শুরু হয়ে গেছে। তারপর নিজস্ব শব্দগত মাত্রা ছাড়িয়ে একটি বিশেষ ধারণা হয়ে ওঠতে শব্দটিকে বেশ চড়াই-উতরাই পেরোতে হয়। তবে, একুশ শতকের প্রথম দশকে এই সম্পর্কিত পঠন-পাঠন, আলাপালোচনা ও তত্ত্বায়ন অনন্য মাত্রা লাভ করে। তখন কেবল সার্বভৌম ক্ষমতার পরিবর্তন কিংবা রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে নয়, ব্যুপনিবেশায়ন বিশ্লেষিত হতে থাকে সাংস্কৃতিক, জ্ঞানতাত্ত্বিক ও দার্শনিক প্রেক্ষিত থেকেও। স্পষ্ট হতে থাকে এর বিভিন্ন ধারাসমূহ। অধ্যাপক ওয়াল্টার মিগনোলো ব্যুপনিবেশায়নের সেই ধারাসমূহের অন্তর্গত একটি ধারার অন্যতম তাত্ত্বিক। ধারাটি ব্যুপনিবেশিকতা নামে পরিচিত। মনে রাখা দরকার, এই ব্যুপনিবেশিকতা ও ব্যুপনিবেশায়ন একই জিনিস নয়। মিগনোলো তার আলাপে এই দুইয়ের পার্থক্য স্পষ্টভাবেই পেশ করবেন।
পেরুর সমাজতাত্ত্বিক আনিবাল কিহানো উপর্যুক্ত ধারার বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। বলতে গেলে, তার প্রবর্তিত ‘উপনিবেশিকতা’র ধারণাটিই ব্যুপনিবেশিকতার কেন্দ্রীয় প্রত্যয়। তার চিন্তাকে পরবর্তীতে তার উত্তরসূরিরা আরও বিকশিত করে গড়ে তোলেন ‘আধুনিকতা/উপনিবেশিকতা’ গবেষণা প্রকল্প। যেখানে আধুনিকতাকে কোনো পরিত্রাণমূলক ধারণা হিসেবে গ্রহণ করা হয় না, বরং বিবেচনা করা হয় উপনিবেশিকতার অলংকৃতি হিসেবে। তাদের কাছে উপনিবেশিকতা ও আধুনিকতা একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ; আধুনিকতার বয়ান দিয়ে উপনিবেশিকতাকেই ঢেকে রাখা হয়। কিহানো ব্যুপনিবেশায়নকে বুঝতেন জ্ঞানতাত্ত্বিক পুনর্গঠন হিসেবে। যে-কারণে, লাতিন আমেরিকার ব্যুপনিবেশায়নের ধারাটিকে জ্ঞানতাত্ত্বিক ব্যুপনিবেশায়ন বলে চিহ্নিত করা যায়। আগেই বলেছি, ব্যুপনিবেশিকতাকে ওয়াল্টার মিগনোলো ব্যুপনিবেশায়ন থেকে আলাদা করে নেন, ঠিক উপনিবেশিকতাকে যেমন পৃথক করে নেন উপনিবেশায়ন থেকে। তবে বান্দুং সম্মেলন ও জোট-নিরপেক্ষ আন্দোলনের মধ্যে ব্যুপনিবেশায়নের একটা পরম্পরাও তিনি নির্দেশ করেন।
নিচের সাক্ষাৎকারে আধুনিকতা/ উপনিবেশিকতা/ব্যুপনিবেশিকতা সম্পর্কে মিগনোলো বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। ব্যুপনিবেশিকতার আদ্যোপান্ত বোঝার ক্ষেত্রে সাক্ষাৎকারটি খুবই সহায়ক হবে এই ভেবে, বাংলা ভাষায় তাত্ত্বিক আলোচনা পড়তে যারা স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন তাদের জন্য, আমরা এটি অনুবাদের কথা চিন্তা করি। ‘Decolonization’ শব্দটির তর্জমা নিয়ে বাংলাদেশে বেশ বিভ্রান্তি আছে। আশির দশকে অনুবাদক আমিনুল ইসলাম ভুইয়া এর অনুবাদ করেছিলেন ‘ব্যুপনিবেশায়ন’। ব্যাকরণগতভাবে এই শব্দটিই সঠিক। পরে বিভিন্ন লেখকের লেখায় ‘বি-উপনিবেশায়ন’ রূপে শব্দটিকে পাওয়া যায়। ব্যুপনিবেশায়ন তৎপরতার ধারাবাহিকতা অস্বীকার না করেও লাতিন আমেরিকায় যেমন সম্পূর্ণ ভিন্ন জ্ঞানতত্ত্বের ব্যুপনিবেশিকতার বিকাশ ঘটে, বাংলাদেশেও তেমনই ‘বাংলাদেশের বিউপনিবেশায়ন তত্ত্ব’ হাজির করে ‘বিউপনিবেশায়ন’। একদিকে, ব্যুপনিবেশিকতা ব্যুপনিবেশায়নের সমালোচনা করে ও তার খামতি নির্দেশ করে; অন্যদিকে বিউপনিবেশায়ন ব্যুপনিবেশায়নের কমতি তো দেখায়ই, তা ব্যুপনিবেশিকতারও সমালোচনা করে। উপরন্তু, তা বাংলাঞ্চলে ব্যুপনিবেশিকতার ধারণাগত সীমাবদ্ধতা ও প্রায়োগিক জটিলতা নির্দেশ করে। বিউপনিবেশায়ন ব্যবহারিকভাবে বাংলাদেশের সমস্যাকেন্দ্রিক তত্ত্ব; চূড়ান্ত বিচারে তা অবলম্বন করে বিদার্শনিক পন্থা।
সমস্যা হলো বাংলাদেশে এখন হরে দরে ‘বিউপনিবেশায়ন’ শব্দটিকে ব্যবহার করে বিভ্রান্তি আরও বাড়িয়ে তোলা হচ্ছে। অথচ বিভ্রান্তি কমানোর জন্যই, সংস্কৃত ব্যাকরণের নিয়মানুযায়ী অশুদ্ধ, এই শব্দটিকে বেছে নেওয়া হয়েছিলো তাত্ত্বিকভাবে নতুন রূপরেখা হাজির করতে। বিউপনিবেশায়ন বাংলাদেশের সমস্যাগুলোকে সম্পূর্ণ ভিন্ন জ্ঞানতত্ত্ব থেকে ব্যাখ্যা করে। অথচ কোনো প্রকার ধারণা না রেখেই, চিন্তার গভীরে প্রবেশ না করেই, অনেকেই এই বানানটিকেই ‘decolonization’-এর তর্জমারূপে ব্যবহার করছেন। এটা হাস্যকর, একইসঙ্গে দুঃখজনক। এই দুইয়ের পার্থক্য বোঝানোর জন্যই, আগে আমরা ‘decolonization’-এর অনুবাদ করতাম ‘বি-উপনিবেশায়ন, কিন্তু বাংলাদেশের চিন্তাচর্চার আলস্য ও দৈন্য এই সামান্য হাইফেনে আটকানো কঠিন প্রতিপন্ন হয়েছে। তাই এখন থেকে আমরা ‘decolonization’-এর অনুবাদ করবো ‘ব্যুপনিবেশায়ন’। শুধু তাই নয়, ‘decolonization’কে যারা অনুবাদ করে, যে-নামেই হোক না কেন, প্রচার করবেন তাকেও আমরা ব্যুপনিবেশায়ন নামেই চিহ্নিত করবো।
যাইহোক, ২২ হাজার শব্দের বিশাল এই সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন অধ্যাপক ওয়েহুয়া হি। তিনি চিনের উহানে অবস্থিত সেন্ট্রাল চায়না নরমাল ইউনিভার্সিটির ইংরেজি ও তুলনামূলক সাহিত্যের অধ্যাপক। তাছাড়া তিনি ফরেন ল্যাঙ্গুয়েজ অ্যান্ড লিচারেচার রিসার্চের ডেপুটি এডিটর-ইন-চিফ। ফলে, হির সঙ্গে আমরা যোগাযোগ করে তাকে আমাদের আগ্রহের কথা জানাই। হি খুব খুশি হয় এবং আমাদেরকে সাক্ষাৎকারটি অনুবাদ ও প্রকাশের অনুমতি দেয়। আগেই বলেছি সাক্ষাৎকারটি বেশ বড়ো। এর মোট তিনটি অংশ। হি এর একটা ছোটো ভূমিকাও দিয়েছেন। হির ভূমিকাসহ নিচে সাক্ষাৎকারটির প্রথম অংশের অনুবাদ রয়েছে। বাকি দুই অংশ পরবর্তীতে প্রকাশিত হবে। সাক্ষারৎকারটি যারা ইংরেজিতে পড়তে আগ্রহী, তাদের জন্য তথ্যসূত্রে এর লিংক দেওয়া হলো।
বিভিন্ন ধারণাসমূহ অনুবাদের ক্ষেত্রে ইচ্ছে করেই বন্ধনীবদ্ধ ইংরেজি শব্দের ব্যবহার পরিহার করেছি। অসর্তকতাবশত কোনো ভুল, আমাদের দৃষ্টিগোচর হলে, পরবর্তীতে তা সংশোধন করা হবে।
ওয়েহুয়া হির ভূমিকা

জ্ঞান সবসময়ই কোনো না কোনো স্থানের হয়ে থাকে। পশ্চিমা তত্ত্বসমূহ নিয়ে কাজ করা একজন চিনা গবেষক হিসেবে তত্ত্বগুলোর মধ্যেকার ইউরোকেন্দ্রিকতা দেখে আমি সর্বদাই হতাশ বোধ করতাম। হতাশাটা প্রথমত আসতো, সেগুলো আমার মনে জমে থাকা জিজ্ঞাসাগুলোকে ছেদ করতো না বলে; দ্বিতীয়ত আমি বুঝতে শুরু করি যে, আমার প্রত্যাশাটাই ছিল ভুল: যে তত্ত্বগুলো ইউরোপীয় ঘটনাবলি ও সমস্যার প্রেক্ষিতে বিকশিত হয়েছে সেগুলো কেনইবা চিনের প্রসঙ্গ ও সমস্যাগুলোকে ছেদ করবে? ২০০৮ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত ডিউক ইউনিভার্সিটিতে বছরব্যাপী স্নাতক পর্যায়ের অতিথি শিক্ষার্থী থাকাকালীন আমি অধ্যাপক ওয়াল্টার মিগনোলোর সেমিনারগুলোতে যোগ দিয়েছিলাম। ক্লাসের আলোচনায় অংশগ্রহণ, অধ্যাপক মিগনোলোর সঙ্গে কথোপকথন, নির্ধারিত সিলেবাস পাঠ এবং অন্যান্য শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ক্লাস উপস্থাপনার মাধ্যমে আমি ব্যুপনিবেশিক ভাবনাচিন্তার রোমাঞ্চকর জগতে প্রবেশ ছিলাম। এটি আমাকে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলির দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্বকে সংজ্ঞায়িত করার জন্য একটি সম্পূর্ণ নতুন দৃষ্টিভঙ্গি জুগিয়েছে। এই বিশ্বায়নের যুগে ক্ষমতার উপনিবেশিকতার জায়গা থেকে সমসাময়িক বিশ্বব্যবস্থাকে নগ্নভাবে দেখানোর জন্য এ-ধরনের চিন্তা বেশ উদ্দীপনাময়।
তবে, ব্যুপনিবেশিক চিন্তাবিদদের কাজ চিনে খুব একটা পরিচিত নয়; যা আমার দেশের জ্ঞানচর্চার পরিধিতে ইউরোকেন্দ্রিকতার বহিঃপ্রকাশেরই উদারহরণ। আমি চিনে ফিরে আসার পর, অধ্যাপক মিগনোলোও বেশ কয়েকবার চিন সফর করেছেন এবং চিনের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে বক্তব্য দিয়েছেন। ব্যুপনিবেশিক চিন্তাবিদদের এই বুদ্ধিদীপ্ত ও মূল্যবান বিষয়গুলো সম্পর্কে চিনা গবেষকদের আরও ভালো এবং সম্পূর্ণ ধারণা পাওয়া প্রয়োজন, তাই তাদেরকে সাহায্য করার জন্য আমি অধ্যাপক মিগনোলোর সঙ্গে যোগাযোগ করি এবং তার একটি সাক্ষাৎকার নেওয়ার প্রস্তাব করি; যাতে চিনা শিক্ষাব্যবস্থায় ব্যুপনিবেশিক তত্ত্বগুলোকে আরো সুশৃঙ্খল পদ্ধতিতে প্রবর্তন করা যায়। অধ্যাপক মিগনোলো চিনের মতো দেশগুলোর শিক্ষাব্যবস্থা সম্পর্কে বরাবরই ওয়াকিবহাল, তাই আমার প্রস্তাবে তিনি সানন্দে রাজি হন। এরই প্রেক্ষিতে আমরা পরস্পরের সঙ্গে ইমেইল বিনিময়ের মাধ্যমে আমাদের সাক্ষাৎকারের ধরন এবং চিনে এই সাক্ষাৎকারের সম্ভাব্য প্রভাব সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা চালিয়ে যেতে থাকি। এই সাক্ষাৎকারটিকে তাত্ত্বিকভাবে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করতে আমি আমার সহকর্মী হাইয়ান শিকে কিছু প্রশ্ন করার জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছিলাম, কারণ তিনি চিনা আধুনিকতা নিয়ে গবেষণা করছিলেন। ২০১২ সালের বসন্তে ওয়াল্টার মিগনোলোর সঙ্গে আমি সাংহাইতে দেখা করেছিলাম। আমরা দুই দিন ধরে হুয়াংপু নদীর ধার দিয়ে হেঁটেছি, হাঁটতে হাঁটতে আলোচনা করেছি, নদীর সামনে অনেকবার সুস্বাদু চা-পান উপভোগ করেছি, লু শুনের মেমোরিয়াল হলো এবং সমসাময়িক শিল্প জাদুঘরের চিনা চিত্রকলার অংশটি পরিদর্শন করেছি এবং এভাবেই আমরা আমাদের সাক্ষাৎকার পর্বটি শেষ করেছি।
সাক্ষাৎকার পর্ব সমাপ্তির পর চিনের কেন্দ্রীয় সম্পাদনা ও অনুবাদ ব্যুরোর মালিকানাধীন একটি গুরুত্বপূর্ণ জার্নাল মার্কসবাদ এবং বাস্তবতা শীঘ্রই এটি সংগ্রহ করে আর তাদের একটি সংখ্যায় প্রকাশ করে। এটি ছিল জার্নালটির সেই সংখ্যায় প্রকাশিত সবচেয়ে দীর্ঘ প্রবন্ধ। চিনের জার্নালগুলি সাধারণত এত দীর্ঘ প্রবন্ধ প্রকাশ করে না। এটি বেশ প্রশংসিত হয়েছিল এবং খুব শীঘ্রই সোশ্যাল সায়েন্সেস উইকলি নামের একটি সাংহাই ভিত্তিক একটি সংবাদপত্র এই সাক্ষাৎকারের একটি সংক্ষিপ্ত সংস্করণও প্রকাশ করে। এই প্রাথমিক প্রচেষ্টার মাধ্যমে আমরা আশা করতেই পারি যে, চিনে ব্যুপনিবেশিক চিন্তকদের আরও কাজ উপস্থাপিত হবে প্রাসঙ্গিক ক্ষেত্রে ব্যুপনিবেশিক ও চিনা পণ্ডিতদের মধ্যেকার আলোচনা জারি রাখার স্বার্থে।
নিচের সাক্ষাৎকারটি ২২০০০ শব্দের দীর্ঘ সাক্ষাৎকারের একটি সংক্ষিপ্ত পাঠ।
প্রথম অংশ
ভূ–রাজনীতি ও ব্যুপনিবেশিকতার উৎপত্তি
প্রশ্ন ১: পূর্বেকার ঔপনিবেশিক ব্যবস্থার পতনের পর সারা বিশ্বে পশ্চিমা মতাদর্শের আধিপত্য চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে। ফলে সে মতাদর্শ বিকৃত হতে হতে তার প্রভাব ক্ষীণতর হয়ে পড়ে। অসংখ্য রাজনীতিবিদ, অর্থনীতিবিদ এবং বুদ্ধিজীবী আধুনিকতার অন্ধকার দিকগুলি উন্মোচনের লক্ষ্যে বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে জড়িত হন। মনে করা হয়, এ-সকল কর্মকাণ্ডে পুরাতন বিশ্বব্যবস্থার যুক্তিগুলো লুকোনো আছে। ফলস্বরূপ, আধুনিকতাকে ঘিরে সৃষ্ট বিতর্কসমূহ শিক্ষাক্ষেত্রে সর্বদা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে, আমরা যদি আধুনিকতার প্রধান ধারণাসমূহ বিবেচনা করি তবে এর বিরুদ্ধে উদ্ভূত তর্কবিতর্ক বিভক্ত হয়ে পড়বে। বিগত পশ্চিমা সাম্রাজ্যের পরিসীমায় আধুনিকতার প্রতিফলন মূলত তাদের উন্নয়নের একরোখা যুক্তি, নারীদের কম গুরুত্বপূর্ণ পদে অবনমন এবং প্রকৃতিগতভাবে প্রাপ্ত সহিংসতাকে নির্দেশ করে। আর, তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলিতে আধুনিকতা নিয়ে তাদের সম্প্রসারণবাদী এবং সাম্রাজ্যবাদী মানসিকতার তোড়জোড়ের কারণে এই ধারণাগুলি ঢাকা পড়ে গিয়েছিল। অধ্যাপক ওয়াং নিং, ওয়াং হুই, ইয়ান জুয়েতং এবং কিন হুইয়ের মতো বিশিষ্ট চিনা পণ্ডিত এই ধরনের প্রকল্পে নিযুক্ত আছেন এবং আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে চিনা পণ্ডিতদের কণ্ঠস্বর সোচ্চার করতে সহায়তা করেছেন। বিদেশে, উত্তর-ঔপনিবেশিক পণ্ডিতদের কুশলী প্রচেষ্টাও বর্তমান বুদ্ধিবৃত্তিক বিতর্ককে রূপ দিতে সাহায্য করেছে। দুর্ভাগ্যবশত, ব্যুপনিবেশিক পণ্ডিতদের লেখাসমূহ চিনে তুলনামূলকভাবে কম পরিচিত, যদিও পার্থ চ্যাটার্জির মতো নামগুলি প্রায়ই এখানে উল্লেখিত হয়। আর আমার ধারণা, ব্যুপনিবেশিক প্রকল্পটি আধুনিকতার সীমা অতিক্রম করার ইচ্ছা থেকেই অনুপ্রাণিত হয়েছিল। আমরা যখন প্রায়ই ভূ-রাজনৈতিক বিষয়ে আলোচনা করি, তখন উত্তর-ঔপনিবেশিক প্রকল্পের ভূ-রাজনীতিকে আপনি কীভাবে বর্ণনা করবেন?
ওয়াল্টার মিগনোলো: এটা অবাক করার মতো কিছু নয় যে, অন্তত এই মুহূর্তে চিনে পণ্ডিত ও বুদ্ধিবৃত্তিক ক্ষেত্রে উপনিবেশিকতার আলাপ নেই। যদিও চিন কখনোই উপনিবেশভুক্ত ছিল না, তথাপি এটি উপনিবেশের কবল থেকে রেহাই পায়নি আর আফিম যুদ্ধই তার প্রমাণ। সমস্যা হলো অনেক মানুষই এখন পর্যন্ত উপনিবেশবাদ ও উপনিবেশিকতার পার্থক্য করতে পারে না। আফিম যুদ্ধের দিকে তাকালে বোঝা যায় যে, উপনিবেশিকতা বোঝার জন্য উপনিবেশবাদের প্রয়োজন নেই। উপনিবেশিকতা হলো একধরনের যুক্তিকাঠামো (যেমন, ক্ষমতার ঔপনিবেশিক মাতৃকা) যার ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠেছে গোটা পশ্চিমা সাম্রাজ্য, যা সাম্রাজ্য বিস্তার ও বিশ্বজুড়ে তাদের হস্তক্ষেপকে দিয়েছে ন্যায্যতা। পশ্চিমা সভ্যতার ভিত্তির সংক্ষিপ্ত রূপই হলো উপনিবেশিকতা। অন্যান্য স্থানের মতো চিনেও ‘উপনিবেশিকতা’ ধারণাটি কেন পণ্ডিতমহলে বুদ্ধিবৃত্তিক মনোযোগ আকর্ষণ করেনি তার আরেকটি কারণ হলো এর উৎপত্তি ইউরোপে নয়, দক্ষিণ আমেরিকায়। সাধারণ মানুষের পাশাপাশি প্রগতিশীলরাও এখনও মানেন যে, তাত্ত্বিকভাবে প্রাসঙ্গিক ধারণাগুলি পশ্চিম ইউরোপ (ফ্রান্স, জার্মানি এবং ইংল্যান্ড, এবং কিছু ইতালি থেকে) এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে আসতে হবে, অন্য কোনোও স্থান থেকে নয়। আরও অনেক জায়গায় মানুষ তাদের নিজস্ব চিন্তাভাবনাকে ভয় পায় এবং মনে করে তাদের সেই চিন্তাভাবনাগুলো প্রকাশের জন্য পশ্চিমা প্রতিষ্ঠান এবং প্রকাশনা সংস্থাগুলির স্বীকৃতি প্রয়োজন। কিন্তু সেটাও যেমন বদলে যাচ্ছে, তেমনি রাজনৈতিক অর্থনীতি এবং তত্ত্বের ক্ষেত্রও বদলে যাচ্ছে। কয়েক দশক আগেও বিশ্বের একটি বিশাল অংশ আইএমএফ এবং বিশ্বব্যাংকের মুখাপেক্ষী ছিল। এখন অনেকেই বলতে শিখছে, ‘না, ধন্যবাদ। আমাদের কাজ করার জন্য আমরাই যথেষ্ট।’ যে মুহূর্তে তৃতীয় বিশ্ব প্রাক্তন হতে চলেছে সেই মুহূর্তে তৃতীয় বিশ্বের এই ধরনের চেতনা এবং মনোভাব উদ্ভূত হয়েছে থেকেই উপনিবেশিকতার ধারণাটি: এটি প্রবর্তিত হয়েছিল পেরুতে, ১৯৯০ সালে, সমাজবিজ্ঞানী আনিবাল কিহোনোর দ্বারা।
দার্শনিকভাবে, ‘জৈবরাজনীতি’-এর পরে ‘উপনিবেশিকতা’ হলো সমসাময়িক বুদ্ধিবৃত্তিক এবং রাজনৈতিক বিতর্কের দুটি মূল ধারণা। ‘জৈবরাজনীতি’ বিংশ শতাব্দীর শুরুতে ইউরোপে উদ্ভূত হলেও একই শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে মিশেল ফুকো এই ধারণার তাত্ত্বিক ভিত্তি প্রদান করেছিলেন। ‘জৈবরাজনীতি’ এবং তারপর ‘জৈবশক্তি’ এর মাধ্যমে ফুকো ইউরোপীয় ইতিহাসের অতীত ও বর্তমানের নির্দিষ্ট বিষয়গুলির মুখোমুখি হয়েছিলেন এবং ব্যাখ্যা করেছিলেন। মূলত, বিভিন্ন সংস্থার অন্তর্গত জনগণকে নিয়ন্ত্রণ করার একটি রূপ সপ্তদশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধ থেকে ইউরোপে কীভাবে আবির্ভূত হয়েছিল এবং পরবর্তী শতাব্দীগুলিতে এটি কীভাবে সম্প্রসারিত হয়েছিল; তা-ই ছিল আলোচ্য। উদীয়মান জাতি/রাষ্ট্রগুলির জন্য জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষেত্রে ‘জৈবরাজনীতি’ এবং ‘জৈবশক্তি’র মতো একটি ধারণার প্রয়োজন হয়ে পড়েছিল। যেহেতু সেই সময়ে জাতি/রাষ্ট্রগুলি কেবল একটি ইউরোপীয় ঘটনা ছিল, তাই এর নিজস্ব ইতিহাসের ফলাফল, জৈব-রাজনীতি এবং জৈব-শক্তি অ-ইউরোপীয় বিশ্বে গুরুত্বপূর্ণ উদ্বেগের বিষয় ছিল না। উদ্বেগের বিষয় ছিল ‘উপনিবেশিকতা’, যার মাধ্যমে ইউরোপ বিস্তৃত হয়েছিল আর এই বিস্তৃতি সাম্রাজ্যবাদিতাকে বিকশিত করার সঙ্গে সঙ্গে বর্ণবাদের জন্ম দিয়েছে, যা আমরা আজ দেখতে পাচ্ছি। উপনিবেশে বর্ণবাদ হলো উপনিবেশিকতার অন্যতম প্রধান উপাদান। সুতরাং, উপনিবেশিকতা/বর্ণবাদ যদি একটি ব্যুপনিবেশিক ধারণা হয় তবে জৈবশক্তি একটি উত্তর-আধুনিক ধারণা। যাইহোক, যেহেতু জৈবরাজনীতি এবং জৈবশক্তি মূলত ফ্রান্সের ইতিহাস এবং ইউরোপের মূল অংশের ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয়েছিল, সেহেতু ইউরোপের মূল অংশের (অর্থাৎ ইংল্যান্ড, ফ্রান্স এবং জার্মানি) মতো ইউরোপীয় সাম্রাজ্য বিস্তারের নেতৃস্থানীয় দেশগুলির সঙ্গে জাতি-রাষ্ট্রও স্থানীয় ইতিহাসকে নিশ্চিত করার আর ইউরোপ থেকে স্বাধীনতা অর্জনের একটি রূপে পরিণত হয়েছিল (যেমন, চিনের সেই প্রক্রিয়া যা ১৯১২ সালে সান ইয়াত-সেনের নেতৃত্বে বিপ্লবের দিকে পরিচালিত করেছিল, অথবা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ থেকে ব্যুপনিবেশায়নের জন্য পরবর্তী সংগ্রামসমূহ)। আধুনিক জাতি-রাষ্ট্রও ইউরোপীয় প্রয়োজনের প্রেক্ষিতে (গির্জা এবং রাষ্ট্রের পৃথকীকরণের মতো) হওয়া এক ইউরোপীয় উদ্ভাবন যা পরে গোটা দুনিয়াতেই ছড়িয়ে পড়ে। আধুনিক জাতিরাষ্ট্র একটি উদীয়মান জাতি-শ্রেণি (শ্বেতাঙ্গ ইউরোপীয় বুর্জোয়া) কর্তৃক নির্মিত হয়েছিল, যা রাজতন্ত্র এবং গির্জার মর্যাদার পদস্খলন ঘটিয়ে রাজনৈতিক উপনিবেশিকতার একটি শক্তিশালী হাতিয়ার হয়ে উঠেছিল।
বলতে গেলে এ-ধরনের ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা এবং পরিস্থিতিই ‘উপনিবেশিকতা’ ধারণাটির জন্ম দিয়েছে। ইউরোপে কেউ ‘উপনিবেশিকতা’ নিয়ে ভাবেনি, তারা তা দেখেনি; তারা তা অনুভবও করেনি। তারা ‘উপনিবেশবাদ’ বুঝতে পারে কিন্তু ‘উপনিবেশিকতা’ অন্য বিষয়। এটি চিহ্নিত করা বেশ কঠিন, তারা কেবল আধুনিকতা দেখে আর উদ্ভাবন করে ‘বিকল্প’, ‘প্রান্তিক’, ‘নিম্নবর্গ’-এর মতো ধারণা, আধুনিকতা ধরেই নেয় যে, বাস্তব কেবল একটিই হতে পারে। আধুনিকতার সম্প্রসারণের মধ্য দিয়ে ইউরোকেন্দ্রিক পণ্ডিত এবং বুদ্ধিজীবীরা উপনিবেশিকতাকেই আড়াল করে চলেছেন।
লাতিন আমেরিকায়—যেখানে উপনিবেশিকতার ধারণার উদ্ভব হয়েছিল—তার ইতিহাস পাঁচশ বছরের দীর্ঘ, আর এটি কেবল ইউরোপের ইতিহাসের সঙ্গেই সম্পর্কিত, কেননা, ইউরোপীয়রাই ছিল বিজেতা, উপনিবেশ স্থাপনকারী, দাস ব্যবসায়ী ও দাস মালিক। এই সমস্ত কিছু ‘আমদানি’ করার পরে, আপনি আর নতুন করে ইউরোপেরই তৈরি করা সমস্যাগুলো মোকাবেলা করার জন্য জৈবরাজনীতি এবং জৈবশক্তি বিষয়গুলো ‘আমদানি’ করতে চাইবেন না। জৈবরাজনীতি এবং জৈবশক্তি স্থানীয় পর্যালোচনার গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার যাকে আসলে এমন একটিমাত্র গল্পে পরিণত করা যায় না যে, শুধুমাত্র ইউরোপেরই সেই সদিচ্ছাটা আছে—সমস্যা ও সমাধান দুই-ই তৈরি করার—যেখানে বাদবাকি বিশ্ব কেবল দেখেই যাবে, যেমনটা একটি টেনিস খেলার ক্ষেত্রে ঘটে থাকে যেখানে আপনার ভূমিকা কেবল দর্শক হিসেবে। ‘উপনিবেশিকতা’ এমন একটি ধারণা যা আক্ষরিক অর্থেই একটি ভিন্ন গল্পের সূচনা করে আর উন্মোচন করে অবদমিত সংবেদনশীলতা, যুক্তিসঙ্গতি, স্মৃতি এবং সর্বোপরি, চাহিদা। ‘উপনিবেশিকতা’ ফ্রাঞ্জ ফানোর গুরুত্বপূর্ণ ধারণা ‘সমাজসৃষ্টি’ ও ‘অভিশপ্তেরা’র পরম্পরা বহন করলেও জৈবরাজনীতি, জৈবশক্তি ও জনতার কাতারে একে ফেলা যাবে না। এ কারণেই জ্ঞানের ভূরাজনৈতিকতা উপনিবেশিকতার একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ আর একই কারণে জৈবরাজনীতি এবং জৈবশক্তি সম্পর্কিত সমস্ত ইউরোপীয় (ও ইউরো-ইঙ্গ-আমেরিকীয়) আলাপে জ্ঞানের সর্বজনীনতা ধরেই নেওয়া হয়।
উপনিবেশিকতার ধারণা (ক্ষমতার ঔপনিবেশিক মাতৃকার ক্ষুদ্র সংস্করণ) দ্বারা যে ধরনের ব্যবস্থাপনা এবং নিয়ন্ত্রণ বর্ণনা করা হয়েছে তা আমাদেরকে সপ্তদশ শতাব্দীতে নিয়ে যায় (ফুকো নিয়ন্ত্রণের এই রূপটিকে জৈব রাজনীতি বলে বিবৃত করেছেন)। যে প্রক্রিয়াগুলোকে আমরা উপনিবেশিকতা বলে বর্ণনা করি তা শুরু হয় পনেরো শতক এবং আটলান্টিক বাণিজ্যিক চক্র গঠনের সময় থেকে। অর্থাৎ, বিশ্ব অর্থনীতিতে যখন অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল আটলান্টিক, শুরু হয়েছিল পশ্চিমা বিশ্বায়ন এবং সেই সঙ্গে উন্মোচিত হতে শুরু করেছিল পশ্চিমা সভ্যতার ভিত্তি। সেখানে যা আবির্ভূত হয়েছিল আর আমরা যাকে উপনিবেশিকতা বা ক্ষমতার ঔপনিবেশিক মাতৃকা রূপে বর্ণনা করি, তা ছিল ব্যবস্থাপনা আর নিয়ন্ত্রণের একটি বিশ্বব্যাপী কাঠামো যা টিকে আছে আজ অবধি। উপনিবেশিকতাই ইউরোপকে ‘ইউরোপ’ হয়ে ওঠতে এবং তার নিজ জনসংখ্যার পাশাপাশি পৃথিবীর অপরাপর অঞ্চলের জনসংখ্যাকেও নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম করেছিল। আফিম যুদ্ধের মাধ্যমে চিন উপনিবেশিকতার প্রভাব এবং পরিণতি অনুভব করেছিল: যদিও তা থেকে উদ্ধার পেতে সময় লেগেছিল অল্পই, আর এখন তো, পাঁচশ বছর ধরে পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলি ও তাদের মধ্যকার জোটগুলির হাতে থাকা, ক্ষমতার ঔপনিবেশিক মাতৃকার নিয়ন্ত্রণ পেতে চিন লড়াই করছে। চিন ও পূর্ব এশিয়ায় ‘প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ আধুনিকতার’ যে তর্ক, সেই সম্পর্কে পশ্চিমা প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবীদের মধ্যেও একটি আলোচনা জারি আছে। ‘বিকল্প আধুনিকতা’র চেয়ে এটাই বেশি যুক্তিসঙ্গত। তা সত্ত্বেও, তারা উপনিবেশিকতাকে আড়াল করে। গত কয়েক দশক ধরে আমরা আধুনিকতা এবং আধুনিকীকরণের নামে…ক্ষমতার ঔপনিবেশিক মাতৃকা নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে ক্রমবর্ধমান দ্বন্দ্ব প্রত্যক্ষ করছি। ‘প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ আধুনিকতার’ মধ্যেও নিহিত রয়েছে উপনিবেশিকতা।
ফলে এখন বুঝে যাওয়ার কথা কীভাবে জৈবরাজনীতি/জৈবশক্তি (ইউরোপীয় বুদ্ধিজীবীদের দ্বারা উন্মোচিত ও বিশ্লিষ্ট) ক্ষমতার জটিল ঔপনিবেশিক মাতৃকার (তৃতীয় বিশ্বের বুদ্ধিজীবীদের দ্বারা উন্মোচিত) কেবল একটি মাত্র দিক। এখানে গুরুত্বপূর্ণ হলো উভয় ধারণারই উৎপত্তিস্থল এবং জানা ও বোঝার ভূ-রাজনীতি। আমি বলছি না যে, তাদের একটিকে দিয়ে আরেকটিকে স্থানান্তর করা যাবে; বরং বলছি যে, উভয়ই সহাবস্থান করবে এবং টিকে থাকবে কিন্তু একে অপরের মধ্যে লীন হয়ে যাবে না। আমাদের চিন্তাভাবনা শুরু করতে হবে জ্ঞানের ভূ-রাজনীতিকে মাথায় রেখে এবং পরিত্যাগ করতে হবে সেই আধুনিক মানসিকতাটিকে যা কেবল একটি কাহিনিকেই আকাঙ্ক্ষিত ও সম্ভব মনে করে আর তোমাকে নির্মূল করতে হবে তাদের সকলকেই যারা সেই একক গপ্পোটা তোমাকে যেভাবে ভাবতে, স্বাদ নিতে ও করতে বলে সেভাবে খাপ খায় না, ভাবে না কিংবা অনুভব করে না।
জৈবরাজনীতি/জৈবশক্তি কোনো সর্বজনীন ধারণা তো নয়ই বরঞ্চ আঞ্চলিক ধারণা, আর তারা যদি বৈশ্বিক হয়েই থাকে তবুও তারা খণ্ডিত, কেননা উপনিবেশ ও প্রাক্তন উপনিবেশগুলিতে অন্যান্য যে-সকল উদ্বেগ ও চাহিদা রয়েছে সেগুলোকে ধারণ করায় তারা অপারগ। তা গুরুত্বপূর্ণ ইউরোপীয় সংবেদনশীলতার জন্য কিন্তু কতিপয় ব্যক্তি, যারা ইউরোপে কী ঘটে চলেছে তার অনুসারী ও প্রচারক, ব্যতীত ধারণাগুলি অ-ইউরোপীয় দুনিয়ার কোটি কোটি মানুষের কাছে অপ্রাসঙ্গিক। ধারণাগুলি কেবল আংশিকভাবে কিছু ইউরোপীয় নিয়ন্ত্রণ কৌশলের জন্য যথেষ্ট হতে পারে তবে ঔপনিবেশিক বিশ্বের জটিলতা বুঝতে এগুলি সাহায্য করার মতো যথেষ্ট নয়। আমরা দাবি করি যে, ‘উপনিবেশিকতা’ বৈশ্বিক, তবে সর্বজনীন নয়। সময়ের বিচারে, এটি ষোড়শ শতাব্দীতে আটলান্টিক বাণিজ্যিক বলয় গঠনের মাধ্যমে শুরু হওয়া বিশ্ব ব্যবস্থার সঙ্গে সম্পর্কিত। রোমান সাম্রাজ্যে, প্রাচীন চিনা রাজবংশগুলিতে অথবা দখলপূর্ব ইনকাদের মধ্যে বিদ্যমান থাকা উপনিবেশিকতা নিয়ে কথা বলার কোনোও মানে হয় না: উপনিবেশিকতা হাতবদল হয়েছে পুঁজিবাদের মাধ্যমে আর ১৫০০ শতাব্দীর পূর্বে এমন কোনো সভ্যতা পাওয়া যাবে না যা পুঁজিবাদী অর্থনীতির ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠেছিল। জৈবরাজনীতি ও জৈবশক্তির গ্রহীতা হিসেবে উপনিবেশিকতা হাজির করেছিল আপামর জনসাধারণের দৃষ্টিভঙ্গিটাকে, এটি ঔপনিবেশিক দুনিয়ার বিস্তৃত পরিসরটিকেই ধর্তব্যের মধ্যে আনে। পার্থক্যটা হলো, উপনিবেশের ইতিহাসে জন্ম নেওয়া ক্ষমতার ঔপনিবেশিক মাতৃকা উপনিবেশের দৃষ্টিকোণ থেকে ইউরোপ এবং উপনিবেশের ইতিহাসকে সংযুক্ত করে দেয়। এক্ষেত্রে, এটি সেই অপরাপর গল্পগুলিকে সামনে নিয়ে আসে যেগুলি ইউরোপীয় দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দুনিয়ার গপ্পো শোনানোর সময় গোপন করা হয়েছিল। দেখতেই পাচ্ছেন, ব্যুপনিবেশিক চিন্তন মনোনিবেশ করে উচ্চারণে, কী বলা হয়েছে তারচেয়ে কে, কখন, কেন এবং কী জন্য বলছে তার ওপর। উপনিবেশিকতার বিশ্লেষণ সদা সর্বদাই একটি ব্যুপনিবেশিক বিবৃতি। তবে, ব্যুপনিবেশিকতা কেবল বিশ্লেষণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয় বরং এটি একটি সম্ভাব্য ধারণাও, যেমনটি আমরা আপনার ১১ ও ১২ নম্বর প্রশ্নে দেখতে পাবো যখন আমরা কথা বলব প্রগতি ও উন্নয়ন সম্পর্কে।
এখন, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারটি হলো: ইউরোপ নিজেকে গড়েই তুলেছিল জ্ঞানের নিয়ন্ত্রণের ওপর (যা তাকে সংহতি এনে দেয় রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, বৌদ্ধিক, শৈল্পিক ও ধর্মীয়ভাবে), এবং ‘জৈবরাজনীতি/জৈবশক্তি’ ছিল সেই নিয়ন্ত্রণেরই একটি অংশ যদিও ধারণা হিসেবে তা ছিল রাষ্ট্রীয় বিধিবিধানসমূহের প্রতি সমালোচনামূলক; ‘উপনিবেশিকতা/ক্ষমতার ঔপনিবেশিক মাতৃকা’ প্রথমত উন্মোচন করে যে, সাম্রাজ্যবাদী ইতিহাস নিজেকে গড়েই তুলেছে উদ্ধারের (খ্রিস্টান বানানো, সভ্য করে তোলা, উন্নয়ন ও আধুনিকীকরণের মাধ্যমে) নাম করে; দ্বিতীয়ত, এটি দেখায় যে, ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদী শক্তি ও পশ্চিমা সভ্যতা উভয়ের অন্তর্নিহিত মাতৃকা টিকেই আছে আধুনিকতার অলংকৃতির ওপর (যা এক উদ্ধারকরণ প্রকল্পের অলংকৃতি) আর উপনিবেশিকতার যুক্তি, এরই গাঠনিক অংশ। এভাবে যে শক্তপোক্ত সিদ্ধান্তটি আমরা হাজির করছি তা হলো উপনিবেশিকতা আধুনিকতারই পরিপূরক আর এটিই ইউরো-আমেরিকীয় সাম্রাজ্যের সম্প্রসারণ ও আধিপত্যের অন্তর্নিহিত কাঠামো। এ-কারণে ‘প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ আধুনিকতা’ আসলে ‘ক্ষমতার ঔপনিবেশিক মাতৃকাটিকে দখলে নেওয়ার লড়াই’কেই নির্দেশ করে থাকে।
এখান থেকে আমরা দুটি সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারি: এর একটি, জৈবরাজনীতি/জৈবশক্তি হলো ক্ষমতার ঔপনিবেশিক মাতৃকারই এক ক্ষুদ্রাংশ (আর কোনো রকম তাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক বুনিয়াদ ছাড়াই ঔপনিবেশিক জৈবশক্তি সম্পর্কে কথা বলা আসলে শব্দ নিয়ে করা দারুণ কারসাজি মাত্র), আর এখন, একবিংশ শতাব্দীতে প্রধান দ্বন্দ্বগুলি ঔপনিবেশিক মাতৃকার দখল নিয়েই। পশ্চিমারা (ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র) আর বেশিদিন নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না। চিনের যে অর্থনৈতিক শক্তি তার সামর্থ্য আছে ঔপনিবেশিক মাতৃকা দখলে শামিল হওয়ার, এবং ব্রিকস দেশগুলির ক্ষেত্রেও তাই। ইইউ, ইউএস ও ব্রিকস, নিঃসন্দেহে, সকলেই এরা পুঁজিবাদী রাষ্ট্র। তারপরও এর মধ্যে পার্থক্য অনেক। ব্রিকস দেশগুলোর (জনসংখ্যা, ভাষা, ধর্ম, গাত্রবর্ণ, লিখন পদ্ধতি) প্রত্যেকটিই বর্ণবৈষম্যের শিকার আর সে-কারণে ইউরোপীয় দৃষ্টিকোণ থেকে ইউরোপের তুলনায় তারা হীনভাবে বর্ণিত হয়। আর বেশিদিন নেই। তাহলে, ঔপনিবেশিক মাতৃকার গঠন, রূপান্তর ও পরে তার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে লড়াইকে বিশ্লেষণ করার সুবাদে ১৫০০ সাল থেকেই আমরা আধুনিক/ঔপনিবেশিক বিশ্বের গড়ে ওঠার ইতিহাস ব্যাখ্যা করতে পারি।
প্রশ্ন–২: অধিকাংশ বুদ্ধিবৃত্তিক প্রকল্পই উপনিবেশগুলির ওপর সৃষ্ট ‘ক্ষত’কে পুনর্বিবেচনার প্রয়াস করে, যেখানে ব্যুপনিবেশিকতাও ভবিষ্য। এ-ধরনের প্রকল্পের আকর্ষণের নেপথ্যে এ-ও হয়তো আংশিকভাবে দায়ী। তাছাড়া ঔপনিবেশিক অতীতকে পুনর্পর্যালোচনা করার ক্ষেত্রে যদি আমরা এর উৎপত্তি, মৌল তত্ত্বের কথা মাথায় রাখি এই প্রকল্পের বিশেষত্বগুলো কী?
ওয়াল্টার মিগনোলো: দুটি ‘বিশেষত্ব’ দাগিয়ে দিয়ে আমি শুরু করব। প্রথমটি সংঘটিত হয়েছিল বান্দুং সম্মেলনে, ১৯৫৫ সালে। সংক্ষেপে, সুকর্নো যা প্রস্তাব করেছিল তা ‘না পুঁজিবাদ, না সাম্যবাদ বরং ব্যুপনিবেশায়ন।’ গিডেন্স কিংবা বেকের মতো কোনো তৃতীয় পথও নয়, ইউরোপীয় আলোকময়তার মুদ্রার উভয় পিঠ থেকেই দূরবর্তী বরং অন্য কিছু। যে ২৯টি দেশের প্রতিনিধিরা সম্মেলনে যোগ দিয়েছিলেন তাদের খেয়াল করেন। সুকর্নো সাফ জানিয়েছেন যে, সম্মেলনে উপস্থিত এই দেশগুলি বিশ্বের তৃতীয় অংশের এক ‘বলয়’ এবং এরা কৃষ্ণাঙ্গ আর অখ্রিস্টীয় ধর্মমতের। অর্থাৎ, ধর্মীয় ও ধর্মনিরপেক্ষ অভিব্যক্তির ভেতর তিনি বর্ণবাদের ইঙ্গিত করছিলেন। দ্বিতীয়ত, ‘ক্ষত’টা ঔপনিবেশিক ও সাম্রাজ্যবাদী উভয়ই এবং ইতিহাসের মধ্য দিয়ে তারা দারুণ সম্পর্ক রক্ষা করে চলে। আফিম যুদ্ধের পর চিনকে যে নিপীড়ন সহ্য করতে হয়েছিল, তাকে ‘সাম্রাজ্যবাদী ক্ষত’ হিসেবে বর্ণনা করাই উত্তম, অটোমান সালতানাতের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য, উদাহরণ হিসেবে, ষোড়শ শতাব্দী থেকে সেখানকার স্থানীয় অধিবাসীরা যে নিপীড়নের ভাগীদার, আর আফ্রিকার ক্ষেত্রে দাস ব্যবসা থেকে শুরু করে ১৮৮৪ সালে মহাদেশটির ইউরোপীয় ভাগাভাগি পর্যন্ত, উপনিবেশবাদ বিনে উপনিবেশিকতা (চিন, অটোমান সালাতানাত) ও উপনিবেশবাদ সহযোগে উপনিবেশিকতার (আফ্রিকা, দক্ষিণ আমেরিকা ও ক্যারিবীয় দ্বীপপুঞ্জ, যুক্তরাষ্ট্রে বাসরত আফ্রিকীয় ও আমেরিকার স্থানীয়রা) মধ্যে ফারাক করতে এর সবটাকে ‘ঔপনিবেশিক ক্ষত’ বলাই শ্রেয়। ধারণাটির ঐতিহাসিক গতিপথ ও যে-সকল চাহিদার প্রেক্ষিতে তা গড়ে ওঠেছে তা উল্লেখপূর্বক একে আরও বিশদভাবে ব্যাখ্যা করা যাক।
ঐতিহাসিকভাবে প্রকল্পটি, যেমনটি আমি আগের অনুচ্ছেদে বলেছি, আধুনিকতা/উপনিবেশিকতা/ব্যুপনিবেশিকতা ও কখনও সংক্ষেপে আধুনিকতা/(বি)উপনিবেশিকতা নামে পরিচিত, উদ্ভূত হয়েছে দক্ষিণ আমেরিকায়। বছর দুয়েক পরে মেক্সিকোতে বসবাসকারী মুক্তির আর্জেন্টিনীয় দার্শনিক এনরিক দুসেল ‘অতিক্রম্যাধুনিকতা’ ধারণাটি প্রবর্তন করেন। অতিক্রম্যাধুনিকতা একইসঙ্গে দুটিকেই নির্দেশ করে যে, আধুনিকতা ছিল একটি ঐতিহাসিক প্রক্রিয়া যেখানে ইউরোপ একাই অগ্রসর হচ্ছিল, তবে এটি ছিল সেই প্রক্রিয়া যেখানে ইউরোপ তার সাম্রাজ্যবাদী/ঔপনিবেশিক সম্প্রসারণের মধ্য দিয়ে নিজেকেই গড়ে তুলেছিল। এ-ই অতিক্রম্যাধুনিকতার বিশ্লেষণ। আর এটিই প্রত্যাশিত যে ভবিষ্যতের পৃথিবী উত্তরাধুনিক না হয়ে হবে অতিক্রম্যাধুনিক, কারণ উত্তরাধুনিক এমন একটি অভিব্যক্তি যা কেবল ইউরোপকেই ইতিহাসের নায়ক হিসেবে স্বীকৃতি দেয়, যখন অতিক্রম্যাধুনিক এমন একটি ভবিষ্যতের দিকে ইঙ্গিত করে যেখানে গোটা দুনিয়াটারই সমান অংশগ্রহণ থাকবে। আমরা ইতোমধ্যেই সেই প্রক্রিয়ার শুরুর দিকে আছি। ইউরোপীয় ইউনিয়নের পতন, আমেরিকার বর্তমান সংকটসমূহ (এনরন পরবর্তী, ইরাক ও ওয়াল স্ট্রিট), এই বার্তাই দেয় যে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাদের বিশ্বাসযোগ্যতা হারিয়েছে আর তাদের নেতৃত্ব ভবিষ্যতের দায়িত্ব তাদের নিজেদের কাঁধেই তুলে নিয়েছে। এখন, এর সবকিছু অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের সঙ্গে সম্পর্কিত হলেও লড়াইটা মূলত ক্ষমতার ঔপনিবেশিক মাতৃকার নিয়ন্ত্রণের যা সেই ঔপনিবেশিক পার্থক্য (ঔপনিবেশিক ক্ষত) ও সেই সাম্রাজ্যিক পার্থক্যকে (সাম্রাজ্যিক ক্ষত) ছেদ করে যাবে। অর্থনৈতিক হিসাবনিকাশ ও রাজনৈতিক কৌশলাদি অনুধাবন, সংবেদন, স্মৃতিমন্থন ও ক্ষতের এই তাৎপর্যপূর্ণ মাত্রাটিকে মাড়িয়ে যেতে পারে না। লাতিন আমেরিকার ‘নির্ভরশীলতা তত্ত্ব’ যতটা তাত্ত্বিক ছিল, ততটাই ছিল আস্তিত্বিক। নির্ভরশীলতা কেবল অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ ছিল না বরং এটি ছিল সেই অনুধাবন ও বাস্তবায়ন যে নির্ভরশীল হওয়া মানে কোনো না কোনোভাবে হীন হওয়া বা অন্তত হেয় অবস্থায় থাকা।
৭০-এর দশকে কিহানো যখন নির্ভরশীলতা তত্ত্বের সঙ্গে যুক্ত, দুসেল তখন সেই একইসময়ে (ষাটের শেষ দিকে ও সত্তরের শুরুতে) ধর্মতত্ত্ব ও মুক্তির দর্শনের প্রারম্ভিক পর্যায়ে। ঐতিহাসিক বিচারে, উপনিবেশিকতার ধারণাটি প্রবর্তিত হয় নব্বইয়ের দশকের গোড়ার দিকে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের ফলাফল হিসেবে। তবে, বিশের দশকে পেরুর বুদ্ধিজীবী হোসে কার্লোস মারিয়াতেগি (গ্রামসির সমসাময়িক) কাজ ছাড়া এটি সম্ভব ছিল না। লাতিন আমেরিকার ঔপনিবেশিক ইতিহাসকে মারিয়াতেগিই পুঁজিবাদের সঙ্গে সম্পৃক্ত করেছিলেন। এভাবে, উভয়েরই সংযোগসাধক সেই অন্তর্নিহিত যুক্তিটিই হলো ‘উপনিবেশিকতা।’ উপনিবেশিকতার যুক্তিটিই যে উপনিবেশবাদ ও পুঁজিবাদ উভয়েরই ভিত্তি আর তা বর্ণবাদকেও ব্যাখ্যা করে, এ-ই ছিল কিহানোর প্রতিভার স্পর্শ, বিশেষ করে এই ধারণা যে, তুমি কখনও তোমার সমান কাউকে শোষণ ও জবরদখল করতে পারো না। জনসাধারণকে চালিত করার লক্ষ্যে আর তাদের শ্রম ও জমি কেড়ে নেয়ার উদ্দেশ্যে তোমাকে তাদের হীন হিসেবে দেখাতে হবে। ঠিক সে-কারণেই আধুনিক/ঔপনিবেশিক বিশ্বে আবির্ভূত হয়েছে বর্ণবাদ, অর্থাৎ ষোল শতকে। ইউরোপীয় ধ্যানধারণার পরম্পরাই যে একমাত্র মাপকাঠি এ-ধরনের ভাবনা নাকচ করতেই আমি কাহিনিটা বলছি। এটি একদম এক; এটি ধ্যানধারণার সেই পরম্পরা যা ইউরোপীয় এবং ইউরো-মার্কিন সাম্রাজ্যবাদী ইতিহাসের ডান থেকে শুরু করে বাম পর্যন্ত সকলেই ধারণ করে। বুদ্ধিবৃত্তিক উচ্চারণের ভরকেন্দ্র যে বৃদ্ধি পাচ্ছে আর কেবল অর্থনীতি ও রাজনীতির ক্ষেত্রেই নয়, জ্ঞানতত্ত্ব ও ব্যাখ্যাতত্ত্বের ক্ষেত্রেও যে দুনিয়াটা বহুকেন্দ্রিক হয়ে ওঠছে এ-ধরনের ভাবনায় ক্রমশ আমরা অভ্যস্ত হয়ে যাচ্ছি। আপনার প্রশ্নের প্রেক্ষিতে এখানে যা দাগিয়ে দেওয়া প্রয়োজন, ধ্যানধারণার পরম্পরা ‘অনুধাবনের কাঠামো’য় (রেমন্ড উইলিয়ামস যেমন ভেবেছিলেন) বদ্ধমূল থাকে, আর অনুধাবনের কাঠামো প্রোথিত থাকে ঔপনিবেশিক ও সাম্রাজ্যিক ক্ষতের (যা উইলিয়ামস ভাবেননি) পরম্পরায়।
ইতিহাস জুড়েই সেই ঔপনিবেশিক ক্ষত, সুনির্দিষ্টভাবে সেই ঔপনিবেশিক ক্ষতই, একটি বর্ধিষ্ণু অর্থনীতি (যেমন, পুঁজিবাদ) যা তার টিকে থাকার জন্য যেকোনো কিছু করতে পারে ও বর্ণবাদের মধ্যেকার জটিলতার মধ্য দিয়ে চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। আটলান্টিক বাণিজ্যিক বলয় বিশ্বকে সংযুক্ত করেছিল আর তারই সর্বশেষ সংস্করণ (নয়া উদারনৈতিকটা), বিশ্বায়ন, আরম্ভ হয়েছিল। এক নতুন ধরনের অর্থনীতির আবির্ভাব ঘটেছিল। ক্ষমতার ঔপনিবেশিক মাতৃকার ঐতিহাসিক ভিত্তিসমূহ একত্রে এমন এক ধরনের অর্থনীতির সূত্রপাত করেছিল তখন পর্যন্ত যার কোনো অস্তিত্ব ছিল না: উদ্বৃত্তের বিপরীতমুখী এক অর্থনীতি ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির স্বার্থে মানবজীবনের ব্যবহার, (যেমন, ক্যারিবীয় আবাদসমূহে খাটানোর লক্ষ্যে বিপুল পরিমাণ আফ্রিকীদের দাসকরণ), নতুন এক রাজনৈতিক রূপের সংগঠন যেখানে মহানগরীস্থ কেন্দ্রগুলো থেকে উপনিবেশগুলি পরিচালিত হতো; যা তাদের দিক থেকে আন্তর্জাতিক আইনের প্রবর্তনকে ত্বরান্বিত করেছিল। শেষে কিন্তু গৌণ নয়, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক উভয় কারণেই প্রয়োজন ছিল বর্ণবাদ। বর্ণবাদ, আজ আমরা যেভাবে বুঝি তা হাতবদল হয়েছে পুঁজিবাদ ও আধুনিক রাষ্ট্রের দ্বারা, এর রাজতান্ত্রিক, নবজাগরণ সংস্করণ ও আধুনিক জাতি-রাষ্ট্রীয়, আলোকময় সংস্করণ উভয়ক্ষেত্রেই: বর্ণবাদ তাদেরই উদ্ভাবন যারা প্রতর্ক ও জ্ঞান নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনা করেছে আর নির্দিষ্ট লোকদের এটা বোঝানোর সামর্থ্য তাদের ছিল যে তারা ঊনমানুষ। বর্ণবাদ আদিবাসী গণহত্যা ও আফ্রিকান দাসত্বের বৈধতা জোটায়: তারা ঊনমানুষ, যেমনটা তাদের ভাবা হতো, তাদের প্রাণ আগেও আর এখনও ব্যবহার্য। ঊনমানুষ হলো সেই মানুষেরা যারা জ্ঞানতাত্ত্বিক ও সত্তাতাত্ত্বিকভাবে ঘাটতিসম্পন্ন। তারা মোটেই যুক্তিবাদী নয়, তাই তারা হীন কিংবা, তারা হীন বলেই, তারা মোটেই যুক্তিবাদী নয়। চারপাশে দেখুন নীতিগুলি এখনও প্রযোজ্য। নারীপাচার ও মানব অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের ব্যবসা থেকে শুরু করে অভিবাসীদের বাণিজ্যিকীকরণ, হাজার হাজার বছর ধরে বসবাসকারী ভূমি ও নদীগুলিকে বিষাক্ত করা, বিশ্ব বাজারের জন্য সোনা আহরণ, আপনি দেখবেন আগে আসে প্রবৃদ্ধির অর্থনীতি, পরে আসে প্রাণ (এই গ্রহ ও আমরা)।
এবার উপনিবেশিকতা এবং ক্ষমতার ঔপনিবেশিক মাতৃকা সম্পর্কে একটু বিস্তারিত বলি, কীভাবে ঔপনিবেশিক ও সাম্রাজ্যিক ক্ষতসমূহ এর গুরুত্বপূর্ণ দিক হয়ে ওঠলো। ক্ষমতার ঔপনিবেশিক মাতৃকা একটি জটিল কাঠামো যাকে আমরা পাঁচটি আন্তঃসম্পর্কিত ক্ষেত্র হিসাবে বর্ণনা করি: জ্ঞান ও বিষয়ীত্বের ক্ষেত্র, অর্থনীতি, কর্তৃত্ব (যেমন, রাজনীতি), লিঙ্গ ও যৌনতা আর ‘প্রাকৃতিক’ জগত (উদাহরণত, আমাদের দেহ যার অংশ এবং বিভিন্ন সম্প্রদায় (খিলাফত, সাম্রাজ্য, রাজতন্ত্র, গির্জা, মসজিদ, জাতি-রাষ্ট্র, আন্তঃসম্প্রদায়গত সম্পর্ক ইত্যাদি) গঠনের মধ্য দিয়ে যা ‘মানব সত্তা’ হিসেবে প্রতিনিয়ত আমাদের ‘হয়ে ওঠা’কে সম্ভব করে)। দেখলেন তো, অনুধাবন ও সংবেদনশীলতার পরিসরটি (গ্রিকরা একে বলতো aiesthesis) কেন আধুনিক দর্শন দ্বারা উপনিবেশিত হয়েছিল আর রূপান্তরিত হয়েছিল নন্দনতত্ত্বে: এমন এক তত্ত্বে যা ‘রুচি’কে নিয়ন্ত্রণ করে। মনে রাখা দরকার, যেমনটি আমি আগেও বলেছি, ষোড়শ শতাব্দীর আগে কিন্তু ক্ষমতার ঔপনিবেশিক মাতৃকা বলে কিছু ছিল না। এটি আপনি প্রাচীন চিন, ভারত কিংবা পারস্য, আফ্রিকার প্রাচীন রাজ্যগুলোতে, প্রাচীন গ্রিস, রোম, ইসলামি খিলাফত বা আন্দিয়ান ইনকানেটে (ইনকারা যেমন একটি সাম্রাজ্য ছিল না একইভাবে রোমানরাও তেমনই ইনকানেট ছিল না) খুঁজে পাবেন না। বলতে গেলে ক্ষমতার ঔপনিবেশিক মাতৃকাই আধুনিকতার নামে সকল সভ্যতাকে ছাড়িয়ে পশ্চিমাদের নিজেদেরকে ‘শ্রেষ্ঠ’ প্রতিপন্ন করার বৈধতা জুটিয়েছে।
এভাবে, আমাদের কাছে যা পুঁজিবাদ (উদাহরণস্বরূপ, ওয়েবার ও লেনিন) নামে পরিচিতি পেল তা ষোড়শ শতাব্দীতে আটলান্টিক বাণিজ্যিক বলয়ের মাধ্যমে আবির্ভূত হওয়া এক সম্পূর্ণ নতুন ধরনের অর্থনীতি। তবে এটি হাজির হলো এক নতুন ধরনের জ্ঞানকাণ্ড নির্মাণ ও বিষয়ী গঠনের মধ্য দিয়ে: সেই আধুনিক ও আধুনিক/ঔপনিবেশিক বিষয়ী। অর্থনীতি আমাদের কাছে ক্ষমতার ঔপনিবেশিক মাতৃকার একটি ক্ষেত্রমাত্র, যদিও ১৯৭০-এর দশক থেকে এটিই প্রধান ক্ষেত্র হয়ে ওঠেছে। উদারনৈতিক ও মার্কসবাদীদের কাছে যা ‘পুঁজিবাদ’, আমাদের কাছে তা হলো ‘অর্থনৈতিক উপনিবেশিকতা’, তার অর্থ এর বাইরেও অর্থনীতির অন্যান্য ধরন রয়েছে যা উপনিবেশিকতার সঙ্গে জড়িত নয়। গত পাঁচশ বছরের অর্থনৈতিক উপনিবেশিকতায়, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর্যন্তও অর্থনীতি ছিল সমাজের অংশ কিন্তু তারপর থেকে সমাজই অর্থনীতির অংশ হয়ে গেল। নব্য-উদারনীতিবাদ ছিল সেই গতিপথের শেষ মুহূর্ত। নতুন বিশ্বে ব্যাপক পরিমাণে ভূমিদখল ও শ্রমের ভয়াবহ শোষণ, শুরুতে ইন্ডিয়ানদের ও পরে আফ্রিকীয়দের দাসকরণের মাধ্যমে অর্থনৈতিক উপনিবেশিকতা গড়ে উঠতে শুরু করে। ত্রিভুজ বাণিজ্যে আফ্রিকীয় দাসদের ক্রয়, বিক্রয় ও আমেরিকায় পরিবহন করা হতো; আমেরিকা থেকে ইউরোপে পণ্যদ্রব্যের (সোনা, রূপা, চিনি, তুলা, তামাক) পরিবহণ গড়ে তুলছিল এক বিশ্ববাজার; দাসদের নিয়ে ব্যবসা করার অস্ত্রের চালান ইউরোপ থেকে যেতো আফ্রিকায়। সমসাময়িক অন্যান্য অর্থনীতির মতো এ-ধরনের অর্থনৈতিক বিনিময়ের দ্বারা প্রাপ্ত উদ্বৃত্তও জমিয়ে না রেখে পুনরায় বিনিয়োগ করা হতো। এই নতুন ধরনের অর্থনীতিই ব্যবহার্য মানবপ্রাণের পরিচায়ক: এটা সম্ভব হয়েছিল সেই বিষয়ীর কারণে যা মানব প্রজাতির মধ্যে এক-ধরনের কর্তৃত্বক্রমকে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলে। আর যারা হেয় (সেটা সেই অর্থনৈতিক চাহিদা ও বর্ণবাদের বৈধতা) বলে পরিগণিত হতো, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির স্বার্থে এবং উচ্চতর প্রজাতির কল্যাণে তাদের জীবন ছিল ব্যবহার্য। আমরা যদি আবারও সেই আফিম যুদ্ধ পর্যালোচনা করি, তাহলে দেখবো যে, সেই লক্ষ লক্ষ চিনা জীবন যা মাদকের কারণে ধ্বংস হয়েছে, তার বদলে ব্রিটিশদের প্রধান জ্ঞাতব্য ছিল লাভ, একইসঙ্গে ইংল্যান্ড ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের লোকেরাও ‘ভোক্তা’ হয়ে ওঠার মাধ্যমে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সম্পদ বৃদ্ধিতেই অবদান রেখেছিল।
এই প্রেক্ষিতেই দুসেল প্রবর্তিত অতিক্রম্যাধুনিকতা ধারণাটির রঙ্গমঞ্চে আবির্ভাব। আর এই ধারণাটি কেন গুরুত্বপূর্ণ? আবারও বলতে হয়, ইউরোপীয় বুদ্ধিজীবীরা যে-ধরনের রূপান্তর ‘অনুধাবন’ করছিলেন তা প্রকাশের নিমিত্তে ইউরোপে উত্তরাধুনিকতা ধারণাটি আবির্ভূত হয়েছিল। উত্তরাধুনিকতা ও অতিক্রম্যাধুনিকতা যে-সকল কুশীলব গড়ে তুলেছেন ও প্রচার করেছেন তাদের ‘অনুধাবন’ কাঠামোর পৃথক ক্ষেত্রে খচিত। অতিক্রম্যাধুনিকতা ঔপনিবেশিক ক্ষতের স্মৃতি বহন করে, আর সাম্রাজ্যিক ক্ষতের সঙ্গেও তা সংলাপে আগ্রহী, যেহেতু এটি এমন একটি ধারণা যা উদ্ভূত হয়েছে বর্ণবাদী এবং প্রান্তীয় জীবনের সংবেদনশীলতা থেকে: দক্ষিণ আমেরিকায় ইউরোপীয় বংশোদ্ভূত ও ক্যারিবীয় হওয়া মানেই ইউরোপীয় হওয়া নয়। এটি ছিল সেই উপলব্ধি যে, ‘আধুনিকতা’ ধারণাটি ইউরোপীয় বংশোদ্ভূত পুরুষ ও মহিলাদের অভিজ্ঞতাকে, এমনকি এই গ্রহের সংখ্যাগরিষ্ঠ অ-ইউরোপীয়দের একটি অংশকেও ধারণ করায় অপারগ। উত্তর-আধুনিকতার ধারণাটি সর্বজনীন সময়ের ঐতিহাসিক মহাখ্যানের ইতি টানতে, ইউরোপের সময়ের অনুধাবন ও সংবেদনশীলতাকেই ধর্তব্য ভেবেছিল (যেমন, হেগেল)। যাইহোক, উত্তর-আধুনিকরা ইউরোকেন্দ্রিক একরৈখিক সময়ের ধারণা থেকে বের হতে পারেনি। সে-কারণেই ইউরোপীয় বুদ্ধিজীবীদের কাছে উত্তর-আধুনিকতা স্বাভাবিকভাবেই আধুনিকতাকে অনুসরণ করে, পার্থক্য আছে, তবে একটি জিনিসেরই তা অন্তর্গত পার্থক্য। বিশ্বের ৮০% লোকের জন্য সেটি এক বিচ্ছিন্ন অভিজ্ঞতা যাদের কাছে আধুনিকতা সবসময়ই ছিল কোনো গপ্পের একটা দিক; অপরটি ছিল উপনিবেশিকতা। সাবেক তৃতীয় বিশ্বের বুদ্ধিজীবীদের কাছে আধুনিকতা ছিল, আর বিভিন্ন রূপে তা অব্যাহতও থাকবে, অতিক্রম্যাধুনিক; অর্থাৎ আধুনিকতা/উপনিবেশিকতাই অতিক্রম্যাধুনিক। আর উদীয়মান অর্থনীতিসমূহ যারা তৃতীয় বিশ্বের (পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মতো) পেছনের সারিতে বসবাস করে তাদের জন্য এটি ছিল, আছে আর থাকবেও অতিক্রম্যাধুনিক। অতিক্রম্যাধুনিকতা উপনিবেশিকতার কাজের ক্ষেত্রটিকে উন্মোচিত করে, অন্যদিকে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ আধুনিকতা এটিকে রুখে দেয়। এই যে ‘স্ল্যাশ’ (/) চিহ্নটি আধুনিকতা ও উপনিবেশিকতাকে একইসঙ্গে যুক্ত করে ও বিভক্ত করে এটি কেবল সামরিক, অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক নয়, এটি বিষয়ীত্বকেও স্পর্শ করে ও গঠন করে: এভাবেই, বর্ণবাদ আর সাম্রাজ্যিক ও ঔপনিবেশিক ক্ষত। এই আধুনিকতা/উপনিবেশিকতার ‘স্ল্যাশ’-এর মধ্যেই ঔপনিবেশিক ও সাম্রাজ্যিক ক্ষত বিদ্যমান আর এখানেই অতিক্রম্যাধুনিকতা বিকশিত হচ্ছে দুনিয়ার ভবিষ্যৎ রূপে।
প্রশ্ন-৩: উপরের আলাপে বারবার আপনি আধুনিকতা আর ব্যুপনিবেশিকতার প্রেক্ষিত থেকে তা বোঝার ওপর জোর দিয়েছেন। তাছাড়া, যেমনটা আমরা খেয়ালও করেছি, আপনার তাত্ত্বিক কাঠামোতে ব্যুপনিবেশিকতা এবং ব্যুপনিবেশায়ন দুটি ভিন্ন ধারণা, কীভাবে আমাদের এই দুইয়ের পার্থক্যসমূহ বোঝা উচিত?
ওয়াল্টার মিগনোলো: আধুনিকতার ধারণাটি তৈরি করা হয়েছিল নতুনত্ব উদযাপনের জন্য। ইউরোপীয়রা নতুন বিশ্বকে খ্রিস্টধর্মে দীক্ষিত করার সময় থেকেই আধুনিকতার ধারণার মধ্যে নতুনত্বের ব্যাপারটি প্রোথিত; যে ভূখণ্ড ও অধিবাসীরা তাদের চেতনায় হাজির হয় পঞ্চদশ শতাব্দীর শেষে। তাই সেই উত্তর-আধুনিকতা ইউরোপীয় মনে ধরা পড়ে, উপলব্ধ হয়, একটি নতুন যুগের চিহ্ন হিসেবে। অ-ইউরোপীয় বিশ্বের অধিবাসীদের জন্য সেই ‘অনুধাবন’টি ভিন্ন ছিল। তারা/আমরা ইউরোপীয় ইতিহাসের সঙ্গে জড়িত কিন্তু সেটি আমাদের যাপনাভিজ্ঞতা ছিল না। আমাদের নিজস্ব ইতিহাসে, দক্ষিণ আমেরিকায় (একইসঙ্গে এশিয়া ও আফ্রিকায়—আপাতত আমেরিকার কথা ধরছি না), সেই নয়া ‘আধুনিকতা’ পরিচিত কিছু ছিল না। আমাদের ইতিহাস ছিল/হলো (কিহানো, দুসেল, আমি এবং প্রকল্পের অন্যান্য সদস্যরা) সেই আধুনিকতা/উপনিবেশিকতা—সেই আটলান্টিক বাণিজ্যিক বলয় গঠন; পুঁজিবাদের সেই ঐতিহাসিক ভিত্তি; আমরা আজ যাকে বর্ণবাদ নামে চিনি; অর্থনৈতিক সম্প্রসারণ, ধর্মান্তরকরণ ও গ্রহটাকে সভ্যকরণের পশ্চিমা প্রকল্পের সূচনার ইতিহাস। আধুনিকতাকে আমরা গিডেন্স ও বেক যেভাবে বোঝে সেভাবে বুঝতে পারি না। আমাদের গাত্রবর্ণ আলাদা, স্বতন্ত্র স্মৃতি, আমাদের স্মৃতি সাম্রাজ্যবাদী ইংল্যান্ডের মতো নয় কিংবা আফ্রিকায় (সেই হেরেরো) ও ইউরোপে (ছয় মিলিয়ন ইহুদি এবং আরও নয় বা দশ লক্ষ ইহুদি নয় এমন) জার্মানির গণহত্যার স্মৃতির মতো নয়। উপনিবেশিকতা ছাড়া আমাদের কাছে আধুনিকতা বোধগম্যই নয়। গিডেন্স ও বেকের ক্ষেত্রে তা নয়। দুসেল উল্লেখ করেছেন যে, ইউরোপের ইতিহাস, ঐতিহাসিকভাবে, ষোড়শ শতাব্দীর ইউরোপীয় রেনেসাঁ ও তারপর আলোকময়তার মধ্য দিয়ে, অ-ইউরোপীয় বিশ্বের সঙ্গে সংসৃষ্ট যাদের ইউরোপীয়রা নিজেদের আয়ত্তে রাখতে চায়। ইউরোপ হয়ে ওঠার জন্য সমগ্র বিশ্ব আর পনেরো শতক থেকে ইউরো-আমেরিকার অংশগ্রহণের সুবাদে সেই আধুনিকতা আসলে অতিক্রম্য-আধুনিকতাও। আর সেই ভবিষ্যৎ হবে অতিক্রম্য-আধুনিক, কিন্তু তার কেন্দ্র আর ইউরোপ ও আমেরিকা থাকবে না। অতিক্রম্য-আধুনিক ভবিষ্যৎ নির্মিত হবে (ইতোমধ্যেই চলমান) বহুবিশ্বের নীতির ওপর। সেই রূপান্তর আমরা ইতোমধ্যেই প্রত্যক্ষ করছি। ব্রিকস দেশগুলি বিশ্বব্যবস্থাকে বিকেন্দ্রিকরণ করছে, যদিও তারা শোষণ, দখল ও শোষণের অর্থনীতি বজায় রেখেছে এবং ওয়েবার ও লেনিন যার নাম দিয়েছেন পুঁজিবাদ। তবে, ব্রিকস দেশগুলি যেমন উদারপন্থী নয়, তেমনই নব্য-উদারপন্থীও নয়। সে কারণেই কনফুসীয় মতবাদ চিনে জনপ্রিয়তা পাচ্ছে। বিপশ্চিমায়নই সেই সাধারণ ক্ষেত্র ব্রিকস দেশগুলিকে যা সেই পথে চালিত করছে। আর অবশ্যই, কনফুসীয় মতবাদ বিপশ্চিমায়নের একটি উপায়, তবে একমাত্র উপায় নয়, বিপশ্চিমায়নের সামগ্রিক ধরন তো নয়ই।
যাইহোক, আধুনিকতা/(বি)উপনিবেশিকতা প্রকল্পটি যা প্রস্তাব করে মোটেই তা বহুকেন্দ্রিক পুঁজিবাদী বিশ্ব নয়। এইভাবে দেখাটা আমাদের বিশ্লেষণেরই অংশ। আমরা যা হাজির করি তা ব্যুপনিবেশিকতা; একটি বহুকেন্দ্রিক ও অ-পুঁজিবাদী দুনিয়ার দিকে যাত্রা, যেখানে অর্থনৈতিক উপনিবেশিকতা নিষ্ফল হয়ে পড়েছে। এটি হবে এমন এক বিশ্বব্যবস্থা যেখানে আধুনিকতার বয়ানের প্রয়োজন হবে না কারণ জীবনের দিগন্ত হয়ে ওঠবে সম্প্রীতি ও সমৃদ্ধির ভেতরে বাঁচা আর প্রগতির জন্য ও আধুনিক হওয়ার জন্য প্রতিযোগিতা যেন ভবিষ্যতে আধুনিকতা এমন কিছু সরবরাহ করবে যা অতীতে সরবরাহ সম্ভব হয়নি, যেহেতু আধুনিকতার ধারণাটির প্রচলন করা হয়েছে।
অ-সাম্রাজ্যবাদী ভবিষ্যতের দিকে বিপশ্চিমায়ন একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। আমি আগেই বলেছি যে, প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ আধুনিকতার বদলে আমরা, এই প্রকল্পে, ক্ষমতার ঔপনিবেশিক মাতৃকা নিয়ন্ত্রণের জন্য লড়াইয়ের কথা বলছি। বিপশ্চিমায়ন তার লক্ষ্যপথসমূহের একটি। ক্ষমতার ঔপনিবেশিক মাতৃকা পশ্চিম (খ্রিস্টধর্ম, উদারনৈতিকতাবাদ, নয়া-উদারনৈতিকতাবাদ ও এমনকি মার্কসবাদ, একই খেলার নিয়মাধীন বিরোধী শক্তি হিসেবে) কর্তৃক নির্মিত, পরিচালিত ও রূপান্তরিত হয়েছিল, একইসঙ্গে ক্ষমতার ঔপনিবেশিক মাতৃকার কারণেই পশ্চিমারা হয়ে ওঠেছিল পশ্চিমা। বর্তমানে, সঞ্চয়নের অর্থনীতি যেমন বৈশ্বিক, অর্থনৈতিক উপনিবেশিকতাও তেমনই বিশ্বব্যাপী। তবে, যা বদলে যাচ্ছে তা হলো অর্থনৈতিক উপনিবেশিকতা আর একটি নির্দিষ্ট কিসিমের রাজনৈতিক নিয়ম ও নীতির প্রতি সংবেদনশীল নয়। এর একটি স্পষ্ট উদাহরণ চিন। যদি ১৯৭৯ সালে চিনের নেতাদের সিদ্ধান্ত হতো সেই খেলার নিয়ম মেনে নেওয়া আর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীল হওয়া, তাহলে চিন আর আজকের অর্থনৈতিক স্তরে থাকত না। একইসঙ্গে, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি আফিম যুদ্ধের ফলে হারিয়ে ফেলা আত্মবিশ্বাস পুনরুদ্ধারে অবদান রেখেছে। বলা যায়, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পরেই থাকে সাম্রাজ্যিক ক্ষত নিরাময়ের কাজ। বিবাদ হয় পশ্চিমা নকশা ও বিশ্ব শাসনে স্ব-নিযুক্তির ইচ্ছা নিয়ে। ক্ষমতার ঔপনিবেশিক মাতৃকার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিবাদ করা হলো সেই চ্যালেঞ্জ ব্রিকস দেশগুলি যা পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদী উত্তরাধিকারের (পশ্চিম ইউরোপ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র) সামনে হাজির করে চলেছে।
কিন্তু কেবল ব্রিকস দেশগুলিই বিপশ্চিমায়ন প্রক্রিয়ায় নিযুক্ত নয়। মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা, দক্ষিণ আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলেও এমন অনেক দেশ আছে। অর্থাৎ, বিপশ্চিমায়ন প্রক্রিয়ার অধীনে অর্থনৈতিক উপনিবেশিকতা অন্তত কিছু সময়ের জন্য হলেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, চিন, ভারত কিংবা ব্রাজিলের মাধ্যমে তার অগ্রযাত্রা ও কার্যকারিতা অব্যাহত রাখবে। তবে বিপশ্চিমায়ন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নতুন নতুন ক্ষেত্র উন্মোচিত হতে থাকবে কারণ উপনিবেশিকতার (হোক তা ভারত, দক্ষিণ আমেরিকা বা আফ্রিকীয় দেশগুলির মতো উপনিবেশিত অথবা চিন ও জাপানের মতো অনুপনিবেশিত) ভুক্তভোগী জনগোষ্ঠী আত্মবিশ্বাস ফিরে পেতে শুরু করেছিল যে আধুনিকতার গালগপ্পোটাকে তাদের/আমাদের থেকে দূরে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিপশ্চিমায়নের একটি পরিণতি হলো যা আমরা ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রত্যক্ষ করছি: তাদের অভ্যন্তরীণ ধস, যেহেতু নিজ দেশে একটি স্বস্তিদায়ক মধ্যবিত্ত শ্রেণি বজায় রাখতে গিয়ে তারা ইউরোপ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে উপনিবেশিকতাকে আর কার্যকর রাখতে পারছে না।
বিপশ্চিমায়নের প্রাসঙ্গিক হওয়ার আরেকটি কারণ আছে, আমার কাছে যেটা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। আমি বিশ্বাস করি যে, গত দুই দশক (সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন থেকে শীতল যুদ্ধের সমাপ্তি পর্যন্ত) ধরে আমরা কোনো রূপান্তরের মধ্যে নয় বরং এক বৈপ্লবিক প্রক্রিয়ার মধ্যে আছি যেখানে গোটা দুনিয়াটাই অংশগ্রহণ করেছে। যে বৈপ্লবিক প্রক্রিয়াটি পৃথিবীকে ‘বাম এবং ডান’-এ ভাগ করার ধারণাটিকে অচল করে দিয়েছে। বাম ও ডানের কার্যকারিতা আছে আলোকময়োত্তর কালের ইউরোপ ও তার পরবর্তী সময়ে, সোভিয়েত ইউনিয়নে, মাও এর চিনে, কাস্ত্রোর কিউবার সীমিত ও আঞলিক জগতে। বর্তমানে, বিপশ্চিমায়ন ও ব্যুপনিবেশিকতা সংকীর্ণ ও সীমিত ইউরোপীয় রাজনীতি ও রাজনৈতিকের (শত্রু ও মিত্র বিচার) ধারণাসমূহকে উড়িয়ে দিয়েছে।
প্রথমত, বিখ্যাত ফরাসি বিপ্লব ছিল একটি উদীয়মান শ্রেণি-গোষ্ঠীর, ইউরোপীয় বুর্জোয়াতন্ত্র, বিপ্লব যা অর্থনৈতিকভাবে ছিল বর্ধিষ্ণু আর অবশেষে গির্জা সমর্থিত রাজতান্ত্রিক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক রাষ্ট্রসমূহের সামনে নিজেদের হাজির করে। এটি ছিল এক শ্রেণি-গোষ্ঠীর বিপ্লব—এতে অংশ নিয়েছিল শ্বেতাঙ্গ, খ্রিস্টান, ফরাসি ও ইউরোপীয়দের একাংশ। এর আগে, ইংল্যান্ডে এ-রকম কিছু ঘটেছিল লেভেলারদের সঙ্গে, সপ্তদশ শতাব্দীর মাঝামাঝিতে, আর তারপর শতাব্দীর শেষের দিকের গৌরবময় বিপ্লবের সময়, যেখানে জন লক এর প্রধান প্রবক্তা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিলেন। এটি ছিল, ওপরন্তু, কারবারী পুঁজিবাদ (অর্থনৈতিক উপনিবেশিকতার একটি রূপ, অন্যান্যগুলো হলো অবাধ বাণিজ্য, শিল্প বিপ্লব, প্রযুক্তিগত বিপ্লব) ও সোনা, রূপা, চিনি, তুলা, তামাক, ঔপনিবেশিক আমলের দাস বাণিজ্য মারফত সমৃদ্ধ ইউরোপের ওপর দাাঁড়ানো এক বিপ্লব যা বুর্জোয়াতন্ত্রকে সামর্থ্যবান করে আর শিল্প বিপ্লবের পথ তৈরি করে দেয়। অন্যভাবে বললে, এটি ছিল ইউরোপীয় তিন শতাব্দীর ঔপনিবেশিক সম্পদের ভিত্তিতে সংঘটিত একটি পুঁজিবাদী বিপ্লব। এখন, ফরাসি বিপ্লবের উদযাপন চলে পুঁজিবাদের সমালোচনার সঙ্গে হাত মিলিয়ে। আসলেই হাস্যকর। ভালো কথা, কিন্তু মূল ব্যাপারটি হলো, যদি সেই ফরাসি বিপ্লব (আর তার আগের ব্রিটিশদের গৌরবময় বিপ্লব) একটি শ্রেণি-গোষ্ঠীর বিপ্লব হয়ে থাকে, তাহলে আমরা এখন প্রত্যক্ষ করছি এক জাতিগত বিপ্লব। সোজা কথা, শ্বেতাঙ্গ ও খ্রিস্টান বুর্জোয়ারা তাদের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি পাকাপোক্ত করার সঙ্গে সঙ্গেই শ্বেতাঙ্গ ও খ্রিস্টীয় অভিজাত্য উপড়ে ফেলেছিল, এখন অ-ইউরোপীয় ও অ-খ্রিস্টীয় কৃষ্ণাঙ্গ বুর্জোয়ারা যদি গত দুই শতকে (উনিশ ও বিশ) শ্বেতাঙ্গ পশ্চিমা বুর্জোয়া কর্তৃক সংস্থাপিত ব্যবস্থা (যেমন, ক্ষমতার ঔপনিবেশিক মাতৃকা) ও নিয়ন্ত্রণকে না উপড়ে থাকে তাহলেও সেই বৈশ্বিক প্রভুত্বকে থামিয়ে দিচ্ছে।
এখন, আপনি বলতে পারেন যে বিপশ্চিমায়ন যে জাতিগত বিপ্লব প্রবর্তন করছে তা পুঁজিবাদকে ব্যবহার করছে। আর সেটা সত্যও। তবে একইসঙ্গে ফরাসি বিপ্লব ও আমেরিকীয় বিপ্লব ছিল সেই ধরনের বিপ্লব যা পুঁজিবাদকে সংহত করেছে। তবে প্রায়শই আমরা এটি ভুলে যাই আর মনে রাখি ‘গণতন্ত্র, স্বাধীনতা, সাম্য’ এইসব সুন্দর সুন্দর শব্দ। ফলে একই সমান্তরালে আমাদের এখন মনোযোগ দেওয়া উচিত যে, বিপশ্চিমায়ন যে পুঁজিবাদকে ব্যবহার করে, তাকে সংহতি দিয়েছে (জ্ঞান, অর্থনীতি, রাজনীতি, লিঙ্গ ও যৌন সম্পর্কের নিয়ন্ত্রণ আর পিতৃতন্ত্র ও বর্ণবাদ মারফত নিজেদের প্রতিষ্ঠাকারী নতুন একটি শ্রেণি-গোষ্ঠী সংহতকরণের মাধ্যমে) সেই মহিমান্বিত, আমেরিকান ও ফরাসি বিপ্লব, অষ্টাদশ শতাব্দী জুড়ে সংঘটিত শ্রেণি বিপ্লবের সমান্তরালে বিপশ্চিমায়ন উন্মোচিত করেছে জাতিগত বিপ্লবের দুয়ার। মনে রাখা দরকার, বিপশ্চিমায়নের বাইরে ও তার সঙ্গে সহাবস্থান করা, আলাদা কিসিমের ব্যুপনিবেশিক প্রক্রিয়া যা প্রবর্তন করছে জাতিগত ও পুরুষতান্ত্রিক বিপ্লব আর কাজ করে যাচ্ছে পুঁজিবাদ বিহীন আর তাই উপনিবেশিকতাহীন একটি বিশ্বের জন্য। এই বিন্দুতে এসে বান্দুংয়ের পরম্পরাটি আবার প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে: সেটি যা প্রস্তাব করেছিল তা হলো ইউরোপীয় আলোকময়তার পরম্পরা থেকে বেরিয়ে আসা আর সেই জাতিগত ও ধর্মীয় মর্যাদা পুনরুদ্ধার করা যা পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদী সভ্যতা এই গ্রহের অধিকাংশ এলাকা থেকে সরিয়ে ফেলেছে। কিন্তু ব্যুপনিবেশিকতা, বিপশ্চিমায়নের বিপরীত, অর্থনৈতিক উপনিবেশিকতার মুখোমুখি হয়: যে-ধরনের নীতিমালা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে (অর্থনৈতিক উপনিবেশিকতা) বহাল রাখে, তার বদলে অভাব ব্যবস্থাপনার অর্থনীতির প্রবর্তন করা না হলে পৃথিবীতে শান্তি, দারিদ্র্যমুক্তি, এই গ্রহে জীবনের বিকাশ সম্ভব নয়। এবং এটা আর পুঁজিবাদ বনাম সমাজতন্ত্র নেই। বরং ব্যুপনিবেশিক ভবিষ্যতের কল্পনার প্রেক্ষিতে সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের কিছু।
ফলে, ব্যুপনিবেশিকতা সেই তৃতীয় বৈশ্বিক শক্তি ভবিষ্যৎ দুনিয়ার অগ্রযাত্রায় বর্তমানকে যা পুনর্গঠন করছে। এর প্রকাশ আমরা দেখতে পাই দক্ষিণ আমেরিকায় তথাকথিত ‘সামাজিক আন্দোলন’সমূহে আদিবাসী ও কৃষকদের ক্রমবর্ধমান জ্ঞানতাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক অংশগ্রহণের শক্তিতে, প্রধানত কলম্বিয়া ও ইকুয়েডর থেকে পেরু হয়ে চিলি ও আর্জেন্টিনা পর্যন্ত আন্দিজ পর্বতমালায় উন্মুক্ত কয়লা খনন পদ্ধতির ধ্বংসযজ্ঞ থামাতে প্রাণাধিকার দাবিকারী শক্তিশালী সংগঠনগুলোর মধ্যে। ‘বহুজাতিক কর্পোরেশনগুলোর ওপর জনসাধারণের নৈতিক ট্রাইবুনাল (Juicio Ético Popular a las Corporaciones Transnacionales)’ এই প্রক্রিয়াসমূহের একটি বলার মতো উদাহরণ। ‘কৃষকদের সেই উপায় (La via campesina)’ আরেকটি উদাহরণ। পরবর্তীকালে, তিউনিসিয়া ও মিশরের বিদ্রোহ, স্পেন ও গ্রিসের ‘বিক্ষোভ (indignados)’, বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্পোরেট রূপান্তরের বিরুদ্ধে চিলি ও কলম্বিয়ার ছাত্ররা, এমনকি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ‘দখল (Occupy)’, আর অবশ্যই বিশ্বব্যাপী ক্রমবর্ধমান বুদ্ধিবৃত্তিক সচেতনতা যে, ব্যুপনিবেশায়ন যদি শীতল যুদ্ধের সময়কার একটি পর্ব হয়, ব্যুপনিবেশিকতা তা অতিক্রম করে গেছে। আর ব্যুপনিবেশিকতা যেমন ব্যুপনিবেশায়নকে অতিক্রম করেছিল, ঠিক তেমনই উপনিবেশিকতাও উপনিবেশবাদকে অতিক্রম করে গেছে। উপনিবেশায়ন বলতে গত ৫০০ বছরের নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক সময়কাল ও দেশগুলিকে নির্দেশ করে, অন্যদিকে উপনিবেশিকতা বলতে আধুনিকতার পরিত্রাণমূলক অলংকৃতির আড়ালে আধিপত্যের যুক্তিকে বোঝায়। উপনিবেশিকতা প্রবর্তনের জন্য সাম্রাজ্যিক আধুনিকতার উপনিবেশের দরকার নেই (১৮৪২ সাল থেকে চিন যেটা ভালো করেই জানে), কিন্তু তার উপনিবেশিকতা প্রয়োজন। অনুরূপভাবে, ব্যুপনিবেশিকতা বলতে ক্ষমতার ঔপনিবেশিক মাতৃকা থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া বোঝায়। এভাবে ব্যুপনিবেশিকতা একটি জ্ঞানতাত্ত্বিক, নীতিগত ও রাজনৈতিক প্রকল্প। যারা পৃথিবী পরিচালনা করে তারা যদি না বদলায়, তাহলে পৃথিবী বদলানো যাবে না; আর জনগণও জনসাধারণের নীতি এবং বাধ্যবাধকতার প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করে বদলায় না। এখানেই কার্ল মার্কসের ভালো উদ্দেশ্য ছিল কিন্তু উপনিবেশিকতা এবং ব্যুপনিবেশিকতা দেখা তার পক্ষে কঠিন ছিল। এটাই সেই ক্ষেত্র যেখানে কার্ল মার্কসের কল্যাণকর অভিপ্রায় উপলব্ধি করা যায়, কিন্তু বর্ণালীর অপরপ্রান্তের উপনিবেশিকতা ও ব্যুপনিবেশিকতা দেখা তার জন্য সত্যিই খুব কঠিন ছিল। পরিবর্তে, তিনি ইউরোপীয় অভিজ্ঞতা (সর্বহারা শ্রেণি)কে বৈশ্বিক ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন। বিকল্প হিসাবে, ইউরোপীয় অভিজ্ঞতাকেই (সর্বহারা শ্রেণি) তিনি ভবিষ্যতের পৃথিবীতে প্রক্ষেপ করেছিলেন।
তথ্যসূত্র
Mignolo, Walter D. & He, Weihua. “The Prospect of Harmony and the Decolonial View of the World: Weihua He Interviews Walter Mignolo.” 2014. https://criticallegalthinking.com/2014/06/12/prospect-harmony-decolonial-view-mignolo/
